আবীর মল্লিক,দুর্গাপুর, ২৭ জুন: ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে জন্ম নেওয়া ইন্দিরা রায়চৌধুরী মাত্র ১৩ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নিজের হাতে তৈরি আজাদ হিন্দ দলে। সেই দলে তিনি ছিলেন কমান্ডার। ইন্দিরা রায় চৌধুরীর পাওয়া আজাদ হিন্দ দলের সেই শংসাপত্র তার নাতি তুলে দিলেন দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারে সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে। আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতেই এই শংসাপত্র প্রদান। কিন্তু প্রশ্ন কে ছিলেন এই ইন্দিরা রায় চৌধুরী? 

 

বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ শাসিত ভারত বর্ষ। চারিদিকে ব্রিটিশদের অত্যাচারে গোটা দেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আর্তনাদ। পরাধীন ভারতবর্ষের গ্লানি কুরে কুরে খাচ্ছে সবাইকে। সেই সময় বীর বাঙালি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আহবানে দলে দলে ভারতবাসী যোগ দিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ দলে। ইতিহাস বলছে আজাদ হিন্দ ফৌজ নেতাজির হাতে তৈরি না হলেও আজাদ হিন্দ দল তৈরি করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নিজেই। ২৭শে অক্টোবর, ১৯৩৩ সাল, জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন ইন্দিরা রায় চৌধুরী । 

​তিনি প্রথমে লন্ডন মিশনারী স্কুল (যার বর্তমান নাম গোরাবাজার শিল্পমন্দির গার্লস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল) পড়াশোনা করেন।স্কুলে পড়াশোনা করার সময় মাত্র ১৩ বছর বয়সে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নিজের হাতে তৈরি আজাদ হিন্দ দলে যোগদান করেন ইন্দিরা দেবী। একজন কমান্ডার হিসাবে কাজ শুরু করেন।কিন্তু এই আজাদ হিন্দ দলের কাজ কি ছিল? ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের যে সমস্ত এলাকাগুলি আজাদ হিন্দ বাহিনী সশস্ত্র বিপ্লব করে দখল করেছিল সেই সমস্ত এলাকাগুলিতে এই আজাদ হিন্দ দলের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা সিভিল সার্ভিস এর কাজ সামলাতেন।সেই এলাকাগুলির মানুষদের সার্বিক সমস্যার সমাধানে আজাদ হিন্দ দলের সদস্যরা একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ইন্দিরা রায় চৌধুরী আজাদ হিন্দ দলের প্রশিক্ষণ শেষে শংসাপত্র পেয়েছিলেন একজন দক্ষ এবং যোগ্য কমান্ডার হিসাবে। 

তারপর মহারানী কাশিশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপরে বহরমপুর কলেজ থেকে স্নাতক (Graduation) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন (Philosophy) নিয়ে স্নাতকোত্তর (Masters) ডিগ্রি লাভ করেন।

​শিক্ষা শেষ করে তিনি বহরমপুরের বি.টি. কলেজ থেকে বেসিক ট্রেনিং (Basic Training) নেন। এরপর বেলুড় গার্লস স্কুলে ২ বছর শিক্ষকতা করেন এবং পরবর্তীতে নিজের প্রাক্তন স্কুল মহারানী কাশীশ্বরী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ানো শুরু করেন। তিনি এ.জি. বেঙ্গল (AG Bengal)-এ চাকরি পেয়েছিলেন, কিন্তু তা করেননি; কারণ তাঁর পরিবারের সকলেই শিক্ষা ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ওই স্কুলেরই টিচার-ইন-চার্জ (Teacher-in-charge)/প্রধান শিক্ষিকা (Headmistress) হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

​১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে, ২৩শে জানুয়ারি কৃষ্ণ কালী ঘোষের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। দিনটি বিশেষভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ সেদিন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন ছিল। 

​ইন্দিরা রায়চৌধুরীর এই দেশাত্মবোধের প্রেরণা ছিলেন তাঁর মামা অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য। অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য সশস্ত্র বিপ্লবের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ‘যুগান্তর’ দলের সাথেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই দেশের জন্য লড়াই করার এবং ‘আজাদ হিন্দ দল’-এ যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা এসেছিল। ইন্দিরা রায়চৌধুরীর বাড়ির আরও অনেকেই সশস্ত্র বিপ্লবের সাথে যুক্ত ছিলেন।সারা জীবন দেশমাতৃকার পূজারী ইন্দিরা রায়চৌধুরী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ঈশ্বর জ্ঞানে পুজো করে গেছেন। পরিবারের সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন দেশপ্রেমিক হওয়ার জন্য। ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি ইন্দিরা রায় চৌধুরীর স্বামী কৃষ্ণকলি ঘোষ এবং মাত্র তিনদিন পরে ২২ শে জানুয়ারি ইন্দিরা রায়চৌধুরী ইহলোক ছেড়ে পরলোকে পাড়ি দেন। ইন্দিরা দেবীর জ্যৈষ্ঠ কন্যা সন্তানের নাম শম্পা রায় এবং একমাত্র পুত্রের নাম অমিতাভ ঘোষ। বহু স্মৃতি তার জড়িয়ে আছে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। ইন্দিরা দেবীর সেই শংসাপত্র তার নাতি অমর্ত্য রায় চৌধুরী নতুন সরকারের পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের দিনে প্রদান করলেন সিটি সেন্টারে দুর্গাপুরের সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর হাতে।অমর্ত্য রায় চৌধুরীর কথায়, ""আগামী প্রজন্ম যাতে করে এই শংসাপত্র দেখে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে পারে সেই জন্যই আমরা শংসাপত্র দুর্গাপুরের সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ""