দুর্গাপুর, ৬ অগাস্ট :গত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরদিন থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন বীর বাহাদুর সিং। পান্ডবেশ্বর ব্লক টিএমসি সহ-সভাপতি তথা বহুলা পঞ্চায়েতের উপপ্রধান বীর বাহাদুর সিং ঝাড়খণ্ডের মধুপুর থেকে গ্রেফতার।
অন্ডাল ও পান্ডবেশ্বর থানায় নির্বাচন-উত্তর হিংসার একাধিক মামলা দায়ের হয় বীর বাহাদুর সিং এর নামে অভিযোগ ।
প্রাক্তন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ এবং বহু বেআইনি কাজকর্মের সাথেও সে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। পান্ডবেশ্বর ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সহ-সভাপতি বীর বাহাদুর সিং অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়েছে। অন্ডাল থানার পুলিশ তাঁকে ঝাড়খণ্ডের মধুপুর থেকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ তাঁকে নিয়ে অন্ডাল থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।বীর বাহাদুরের খোঁজ বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল। তিনি পান্ডবেশ্বরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা টিএমসি জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন, তবে বেশ কিছুদিন ধরে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। ডিসিপি (DCP) রসপ্রীত সিং তাঁর গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বীর বাহাদুর একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছিলেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা তীব্র হয়। ওই ভিডিওতে তিনি টিএমসির প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা প্রাক্তন বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে চরম তোপ দাগেন এবং নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তৃণমূল কর্মীদের কোনো খোঁজখবর না নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে বিজেপি নেতাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তোপ দেগে এই ভিডিও বার্তা সামাজিক মাধ্যমে ছরিয়ে দেয় বীর বাহাদুর সিং। তবে নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গী থাকাকালীন বিগত পাঁচ বছর ধরে বিজেপি নেতা জিতেন্দ্র তিওয়ারিকে তীব্র আক্রমণ করতে থাকা বীর বাহাদুর আচমকাই সুর বদল করে ওই ভিডিও বার্তাতে পাণ্ডবেশ্বরের বর্তমান বিধায়ক জিতেন্দ্র তেওয়ারির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। তবে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার বহু সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্সে বীর বাহাদুরের অত্যাচার ও অন্যায়ের কথা তুলে ধরে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেয়।
২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর বিজেপি কর্মীদের ওপরে অত্যাচারের একাধিক মামলা
অন্ডাল ও পান্ডবেশ্বর থানায় বীর বাহাদুর সিংয়ের বিরুদ্ধে বিজেপি কর্মীদের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। অনেকের অভিযোগ, ২০২১ সালের নির্বাচনের পর তাঁর নেতৃত্বে মানুষের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
ভয়ে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান এবং কয়েকমাস পর যখন তাঁরা ফিরে আসেন, তখন তাঁদের কাছ থেকে তোলাবাজি করা হয়। নির্বাচনের আগেই বীর বাহাদুরের গুণ্ডাগিরির একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে এক যুবককে মারধর করতে করতে তাঁকে কেকেএসসি (KKSC) কার্যালয়ে নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল।অথচ ২০১৬ সালে জিতেন্দ্র তিওয়ারি পাণ্ডবেশ্বর তৃণমূল বিধায়ক হওয়ার পর এই বীর বাহাদুর সিং জিতেন্দ্র তিওয়ারিরও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
রাজ্যে টিএমসি সরকার ক্ষমতায় আসার পর
২০১৬ সালে জিতেন্দ্র তিওয়ারি বিধায়ক হওয়ার পর বীর বাহাদুর তাঁর ডানহাত হয়ে ওঠেন।জিতেন্দ্র তিওয়ারির সমর্থনে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বীর বাহাদুর বহুলো গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান হন এবং এলাকায় তাঁর প্রভাব হু-হু করে বাড়তে থাকে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে জিতেন্দ্র তিওয়ারি বিজেপিতে যোগ দিলে বীর বাহাদুর তৎকালীন টিএমসি বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সাথে হাত মেলান।
নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ছত্রছায়ায় পান্ডবেশ্বর ব্লক ও অন্ডাল এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। স্থানীয়দের দাবি, রাজনীতির সুযোগ নিয়ে বীর বাহাদুর খুব কম সময়ে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছিলেন। জানা যায়, তিনি দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন এবং কাজের খোঁজে কিছুদিন দিল্লিতেও গিয়েছিলেন, তবে পরে ফিরে এসে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
ভোটের ফল প্রকাশের দিনও তিনি প্রাক্তন বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সাথে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন এবং ধর্নায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার পর থেকেই তিনি এলাকা ছেড়ে নিখোঁজ ছিলেন।
২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ এই দশ বছর অন্ডাল এবং পাণ্ডবেশ্বরের বহু বেআইনি কাজকর্মের সাথে নাম জড়িয়েছে এই বীর বাহাদুর সিং এর। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে শুক্রবার তাকে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হবে পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানিয়ে।