বিশেষ সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:

দক্ষিণবঙ্গের চিকিৎসা মানচিত্রে যুক্ত হলো এক ঐতিহাসিক সাফল্যের পালক। দীর্ঘদিনের পেটের যন্ত্রণায় কষ্ট পাওয়া ৪৫ বছর বয়সী এক প্রৌঢ়ার পিত্তনালীর বিরল ও জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হলো দুর্গাপুরের 'দ্য মিশন হাসপাতাল'-এ। আধুনিক রোবোটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে 'টাইপ-১ কোলেডোকাল সিস্ট' অপসারণ করে চিকিৎসায় এক অভাবনীয় নজির গড়লেন প্রখ্যাত গ্যাস্ট্রো ও হেপাটোবিলিয়ারি-প্যানক্রিয়াটিক (HPB) সার্জন ডঃ বিজিত সাহা।

বিজ্ঞাপন

পিত্তনালীর জন্মগত অস্বাভাবিক স্ফীতির কারণে তৈরি হওয়া এই ‘কোলেডোকাল সিস্ট’ সময়মতো না কাটালে সংক্রমণ, জন্ডিস, এমনকি ভবিষ্যতে ক্যানসারের রূপ নেওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। ওই প্রৌঢ়া দীর্ঘদিন ধরে পেটের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। এমআরআই (MRI) রিপোর্টে সিস্ট ধরা পড়ার পর তিনি রাজ্য ও দক্ষিণ ভারতের একাধিক প্রথম সারির হাসপাতালে যান। কিন্তু রোগীর পিত্তনালী অত্যন্ত সরু (মাত্র ৫ মিলিমিটার) হওয়ায় পোস্ট-অপারেটিভ পিত্ত রস বা 'বাইল লিক'-এর উচ্চ ঝুঁকির কথা জানিয়ে সব জায়গাতেই তাঁহাকে চিরাচরিত উন্মুক্ত বা 'ওপেন সার্জারি'র পরামর্শ দেওয়া হয়।

অবশেষে দুর্গাপুরের দ্য মিশন হাসপাতালে ডঃ বিজিত সাহার (MS, MCh, AIIMS) শরণাপন্ন হন তিনি। ডঃ সাহা ও তাঁর চিকিৎসক দল রোগীকে ওপেন সার্জারির বদলে অত্যাধুনিক রোবোটিক অ্যাসিস্টেড সার্জারির পরামর্শ দেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, উন্নত রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহারে রক্তপাত যেমন নগণ্য হবে, তেমনই যন্ত্রণামুক্ত ও দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা শতভাগ।

পরবর্তীতে সফলভাবে সম্পন্ন হয় ‘রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড কোলেডোকাল সিস্ট এক্সিশন উইথ রু-এন-ওয়াই হেপাটিকোজেজুনোস্টমি’ (Roux-en-Y Hepaticojejunostomy)। মাত্র ৫ মিলিমিটারের অত্যন্ত নিখুঁত পিত্তনালীর সাথে ক্ষুদ্রান্ত্রের পুনর্গঠনটি রোবটের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের সাহায্যে সম্পূর্ণ করেন চিকিৎসকরা।

অস্ত্রোপচারের পর কোনো প্রকার 'বাইল লিক' হয়নি। এমনকি অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধেরও প্রয়োজন পড়েনি রোগীর। অভাবনীয়ভাবে অস্ত্রোপচারের মাত্র তৃতীয় দিনেই (POD 3) সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়।

চিকিৎসা জগতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গাপুরের মতো শহরে এই মানের জটিল হেপাটোপ্যানক্রিয়াটোবিলিয়ারি (HPB) রোবোটিক অস্ত্রোপচারের সাফল্য গোটা দক্ষিণবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য একটি বিরাট বার্তা। এতদিন যে ধরনের জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য সাধারণ মানুষকে ভিন রাজ্যে ছুটতে হতো, তা এখন ঘরের কাছেই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সুনিশ্চিত হচ্ছে।